গল্পঃ মুয়াজ্জিনের জ্বীন। FH Shishir

0
96

আমি মিম কে ভালোবাসি, কিন্তু কোনদিন বলতে পারিনাই। অধিকাংশ ছেলেদের যে সমস্যা হয় আমারও ঠিক তেমন। ওকে দেখলে আর সাহস করে এগুতে পারিনা। আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন প্রেম বা সম্পর্ক না হতেই কেমনে মানুষ ভালোবাসে!আমি তা জানিনা। কিন্তু আমি যে তাকে ভালোবাসি এটা কসম খেয়ে বলতে পারি। ওর প্রতি আমার যে অনুভূতি কাজ করে সেটা শুধু আমিই জানি। ওকে শুধু দূর থেকে দেখেই যাই, সেও হয়তো বুঝতে পারে আমার মনের অবস্থা, কিন্তু এতদুর পর্যন্তই। ওর সাথে কথা বলার আর সাহস হয়না।আম্মু বলেছে আল্লাহ সব কিছু দিতে পারেন। তিনি আমাকে নামাজ পড়তে বলেন সব সময়। যেহেতু মিমের সামনে গিয়ে কিছু বলার সাহস হয়না সেহেতু আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আল্লাহর কাছে মিম কে চাইবো। নামাজ পড়বো।এবার হয়তো একটু বুঝতে পারছেন আমার ভালোবাসার গভীরতা। আমি নামাজ শুরু করেছি। প্রতিদিন তয়জাল মুন্সির আজান শুনলেই সব ছেড়েছুড়ে মসজিদে যাই। অপেক্ষায় থাকি কখন তয়জাল মুন্সির আজান শুনতে পাবো। এই লোকটাই পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেয় আমাদের মসজিদে। এবং আমি এতোটাই মগ্ন হয়ে থাকি তার আজানের অপেক্ষায় যে তার আজান দেয়ার বৈশিষ্ট্যও মুখস্থ হয়ে গেছে আমার। সে ঠিক যেভাবে আজান দেয়, আমিও ঠিক সেভাবে আজান দিতে পারি।কিন্তু তার মত করে আজান দেয়াটাই যে আমার জীবনের বিরাট একটা কাল হয়ে দাঁড়াবে সেটা কে জানতো!**তয়জাল মুন্সির একটা বৈশিষ্ট্য হলো তিনি কাউকে আজান দেয়া দেখতে পারেন না। যদিও তিনি কখনো আজান দেয়া সচারচর মিস দেন না, তবুও কয়েকবার আসতে দেরী হওয়ায় অন্যরা আজান দিয়েছিলো। এতে তিনি খুবই ক্ষেপে যেতেন। আমাদের মসজিদে কোন স্থায়ী মুয়াজ্জিন নেই, মুয়াজ্জিনের দরকারও ছিল না, কারন তয়জাল মুন্সি ছিল আমাদের। তার ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বড় বড় টান দিয়ে আজান দেয়াটা একরকম কমনই ছিল। গ্রামে যারা নামাজ পরতো না তারাও তয়জাল মুন্সী বাদে অন্যকেউ আজান দিলে ব্যাপারটা খেয়াল করতো।একবার মুন্সীর নিজের ভাই ই আজান দিয়েছিলো। কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো তয়জাল মুন্সী কোত্থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে।এসেই রাগারাগি শুরু ভাই এর সাথে।- তুই কেন আজান দিলি?- তুমি তো ছিলা না ভাইজান।- ছিলাম না মানে? ৫ মিনিট দেরী হইলেই তোরে আজান দিতে হবে?- ভাইজান, ভাবলাম তুমি আজ আসবা না তাই…- কোনদিন আমি আসিনাই? হ্যা? কই, ফযরে বা যোহরে তো তোগো কাউরে দেখিনা আজান দিতে? এশায় কেন আগে ভাগে আসিস? হ্যা?- ভাইজান, একটু আজানই দিছি, আল্লাহর দিকে ডাক দিসি, এতে এত দেমাগ দেখাও ক্যান?- দেমাগ দেখাই আমি? এতবড় কলিজা তোর এম্নে কথা কইস আমার লগে?- খারাপ কি কইসি হ্যা? আর এমনে কইলেই বা কি করবা তুমি?- আমারে ক্ষেপাইস না কইলাম, আমার সাথে জ্বীন আছে!তয়জাল মুন্সী মাঝে মাঝেই ক্ষেপে গেলে তার তথাকথিত জ্বীনের কথা বলতেন। তার সাথে নাকি কি এক জ্বীন আছে আর তিনি চাইলেই যে কারো ক্ষতি করতে পারেন সে জ্বীন কে দিয়ে। আমরা সবাই আড়ালে হাসাহাসি করতাম এসব নিয়া।যাই হোক, তয়জাল মুন্সী একদম বুড়ো হওয়া অবস্থাতেও আজান দিতেন। তার আসতে দেরী হলেও কেউ তার স্থান দখল করার সাহস পেতো না। যদিও কেউ তার জ্বীনের ভয় করতো না, শুধু তার সাথে ঝামেলায় যেতে চাইতো না। আর এতদিনে আমিও মিম কে ভালোবেসেই যাচ্ছি, ওকে পাওয়ার জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি। আপনারা হয়তো ভাবছেন আমি কেমন মানুষ যে শুধু একটা মেয়েকে পাওয়ার জন্য নামাজ পড়ছি। ভেবে লাভ নাই, আমি ওকে ভালোবাসি।**প্রায় ২০ মিনিট পার হয়ে গেলো তয়জাল মুন্সীর কোন খোঁজ নেই। গেছে কোথায় বুড়ো টা? আর দশ মিনিট পর জামাত দাঁড়াবে। অথচ কেউ আজান দিতে সাহস পাচ্ছেনা। আজান দিলে ঠিকই পরে তয়জাল মুন্সীর রোষানলে পরতে হবে।আমি এসব কাহিনী দেখে দেখে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি। ওই বুড়ো কে এত ভয় পাওয়ার কি আছে! আরো ৫ মিনিট পর শেষে আমিই এগিয়ে গেলাম। আজান দিলাম। একদম হুবহু তয়জাল মুন্সীর মত করে। আমি অনেক চেষ্টা করেও অন্যভাবে আজান দিতে পারিনা, কারন এতদিন অনেক মন দিয়ে মুন্সীর আজান শুনে শুনে তার টাই গলা দিয়ে বের হয়।আজান শেষ করার পর পেছনে ফিরে দেখি সবাই আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। বুঝলাম না এমন ভাবে দেখার কারন কি! বুঝতে সময়ও লাগলো না। বামপাশে & তয়জাল মুন্সী চোখ লাল করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছেউ  ওই চোখ থেকে আগুন বের করে ঝলসে দিবে আমাকে, তারপর লবণ মাখিয়ে খাবে। কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও সামলে নিলাম। বললাম “জামাতের সময় হয়ে যাচ্ছিলো তাই আজান দিয়েছি।”অবাক করা বিষয় হলো মুন্সী আমাকে কিচ্ছু বলেন নাই।নামাজ পড়লাম, মিম কে পাওয়ার দুয়া করলাম। শুনেছি মন থেকে চাইলে আল্লাহ সবই দেন। আমার মনে যে মিমের বসবাস তাই হয়তো মন থেকে চাইতে পারছিনা সেভাবে, তাই মিম কেও পাচ্ছিনা। কিন্তু আমি হাল ছাড়বো না।**ভোরের অনেক আগেই ঘুম ভেঙে গেলো আমার। আজান দিতে আরো দেরী আছে। কিছুক্ষণ মিমের কথা ভাবলাম, কালকে ওকে অনেক সুন্দর লাগছিলো কেন জানি। চোখে মনে হয় কাজল দিয়েছিলো, আর কেমনে বাকা বাকা চোখে তাকায় আমার দিকে। ভালোই লাগে।উঠে পরলাম একটু পরেই। দাঁতন টা মুখে দিয়ে হাঁটা দিলাম মসজিদের দিকে।জঙ্গলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন জানি অনুভূত হতে লাগলো আমার। কেউ মনে হচ্ছে আমাকে দেখছে। অস্বস্তি লাগা শুরু হলো। আশেপাশে তাকালাম। কাউকে দেখতে পেলাম না।কিছুদুর যেতেই হঠাৎ করেই দমকা হাওয়া শুরু হলো। সেই হাওয়া ঘুর্ণি তে রুপ নিলো। সামনে আগানো দুঃসাধ্য হয়ে গেলো। এমন হঠাৎ করেই এসব কিভাবে শুরু হলো বুঝলাম না। গমগম করে কে যেন আমাকে সালাম দিলো। আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এই ঘুর্নির ভেতর থেকেই শব্দটা আসছিলো। এবার আমার নাম ধরে ডাকলো। আমি এবার একদম ভয় পেয়ে গেলাম। শরীরের পেছন দিকটা ঠান্ডার মত জমে গেলো মনে হচ্ছে। ঢোক গিলে বললাম,- কে….?কেউ যেন ভরাট গলায় বললো,- আমার হুজুর বেশিদিন আর বাঁচবেন না, আমি আমার হুজুরের আজান ভালোবাসি। ঠিক তুই যেমন সেই মেয়েটাকে ভালোবাসিস। আর তুই একদম হুজুরের মত করে আজান দিস। তাই আমি তোকে বলছি, হুজুরের পর থেকে তুইই এই মসজিদে আজান দিবি। কাঁপা-কাঁপা গলায় বললাম,- ক-কে আপনা-র.. হ-হুজুর? – মুন্সী!- আ..আমিই পারবো..বো.. ন-না..আমি আ-আমার পড়া-শুনা চ-চালিয়ে য-যেতে চাই…- আমি যা চাই তাই হয়, এবং হবে। তুইই হবি এই মসজিদের মুয়াজ্জিন। হঠাৎ মনে হলো আমি মনে হয় মুন্সীর জ্বীনটার সাথে কথা বলছি। এবার ভয়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌছে গেলাম। দুয়া দুরুদ পড়তে গিয়ে দেখলাম কিচ্ছু মনে পরছেনা। সব বাদ দিয়ে আল্লাহর নাম ডাকা শুরু করলাম। গমগম করে আবার বলে উঠলো,- হুজুর অসুস্থ, আজকের আজান টা তুই দিয়ে দিবি।- ন-না…আম-মি বাড়ি… য-যাবোএবার হঠাৎ করেই আমার শরীর পাথরের মত জমে গেলো। হাত পা সব অসাড়। নাড়াতে পারছি না। আমার হাত থেকে দাঁতন টা পরে গেলো। কিছুক্ষণ পর সরাৎ করে আমার চোখে কি জানি ঢুকে গেলো। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় চিৎকার করতে গিয়েও গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না। বাম চোখ থেকে খুলে জিনিস টা এবার আমার ডান চোখে ঢুকে গেলো। সাথে সাথে মাটিতে পরে গেলাম। হাত পা নাড়াতে পারলাম। হাত দিয়ে চোখ থেকে জিনিস টা খুলে বুঝতে পারলাম ওটা আমার দাঁতন। সব কিছু অন্ধকার হয়ে যাবার আগে শুনতে পেলাম সেই গমগম শব্দ আবার,”তুইই হবি এই মসজিদের মুয়াজ্জিন!”**তয়জাল মুন্সী মারা গেছে। আর আমি এক মাস হলো বাসায় পরে আছি। চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। এর ভেতরে আমার গল্প শখানেক বার সবাইকে বলেছি। বিশ্বাস করছে কিনা তারা জানিনা। আমার খুব বড় ক্ষতি হয়ে গেলো। সব চাইতে আফসোস লাগছিলো যে আমি আর মিম কে দেখতে পাবোনা। তবে অবাক করা বিষয় হলো আমি এইকয়দিন মিমের চেহারা মনে করার চেষ্টায় সফল হয়েছি। একদম পরিষ্কার ভাবে ওর চেহারা আমার মনে গেঁথে আছে।বিকেলে মসজিদের হুজুর আসলেন বাসায়। আমাকে তিনি যা বললেন তার সারমর্ম হলো, “দেখো বাবা, মসজিদে একজন মুয়াজ্জিন লাগবে। তুমি তো বসেই থাকছো, মসজিদে থেকে পাঁচ বেলা আজান দিবা, মাসে মাসে কিছু টাকাও পাবা, যা তোমার বাসায় দিতে পারবা। তোমার গরিব বাবা মা তো অনেক করলো তোমার জন্য, অন্ধ হয়েও কিছু একটা তাদের জন্য করতে পারবা।”আসলেই, এভাবে বোঝা হয়ে থাকছি পরিবারে। কতই না কষ্ট দিচ্ছি সবাইকে। আমি জানি মসজদের মুয়াজ্জিন হলে জ্বীনটাকে জিতিয়ে দেয়া হবে। ওর কাছে মাথানত করা হবে। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম আমার এমন ভাগ্য আমি ফেরাতে পারবো না। আমাকে মুয়াজ্জিন বানিয়েই ছাড়বে সে আজ হোক বা কাল। সে মুন্সীর আজান ভালোবাসে এবং তার ভালোবাসার বিনিময়ে সে আমার আজান পাবে, আমি যে মিম কে ভালোবাসি, আমিও হয়তো এর বিনিময়ে তাকে পেলেও পেতে পারি— এই আশায় হয়ে গেলাম মুয়াজ্জিন। কিন্তু মুয়াজ্জিন হবার পরে জ্বীনের অত্যাচার আরো বাড়লো। মানসিক যন্ত্রণা দেয়া শুরু করলো। প্রতিবার আজান দেয়ার পরে আমি শুনতে পাই তার গমগম আওয়াজে হাসি। টিটকারি মারা হাসি। আমার অসহায়ত্ব দেখে এবং তার বিজয় দেখে সে এমন করে হাসে। আমি আর তাকে ভয় পাইনা কিন্তু আমার ভেতর টা জ্বলে যায় তার হাসি শুনলে। সে হাসে আর আমার মনে হয় সে বলছে, “বলেছিলাম না, তোকে মুয়াজ্জিন বানাবোই”তার হাসি আমার শরীরের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন জ্বেলে দেয়। যখন এমন অবস্থা হয় আমি মিম কে মনে করার চেষ্টা করি। আশ্চর্যজনক ভাবে হলেও ওর স্পষ্ট ছবি দেখতে পাই মনের ভেতর আর সব জ্বালা ভুলে যাই। আমার দেহের নিয়ন্ত্রণ জ্বীনটা নিতে পারলেও আমার মনের টা নিতে পারেনা। সেখানে শুধুই আমার মিমের অবস্থান।**যতদিন যায়, জ্বীনের হাসি ততই অসহ্য হতে লাগলো আমার কাছে। এতোটাই অসহ্য যে আমি মাঝে মাঝে মিমের চেহারাও মনে আনতে পারিনা। নিজের উপর রাগ উঠে। কিছুই করতে পারিনা জ্বীনটার বিরুদ্ধে। মসজিদের হুজুর, যারা নামাজ পড়তে আসে সবাইকে আমার অবস্থা বলার ব্যার্থ চেষ্টা করেছি। কেউ বিশ্বাস করেনা আমার কথা। মাঝে মাঝে কাঁদি, মাঝে মাঝে আল্লাহর কাছে বিচার দেই, মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে নিজেকে কোনভাবে খুন করে ফেলি। কিন্তু উপায় পাইনা।পাঁচ ওয়াক্ত আজান দেই। ঠিক মুন্সীর মত করে। আজান দিতে গেলে মনে হয় আজান আমি না, মুন্সী নিজে দিচ্ছে। পাশে কারো উপস্থিতি অনুভব করি, যে মন দিয়ে আজান টা শুনছে।আমার রাগ উঠে, প্রচন্ড রাগ, জ্বীনটার এমন অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছা হয়, সে আমার মিম কে পেতে দেয়নাই, মিম কে দেখতে পর্যন্ত পাচ্ছিনা শুধু তার জন্য। আমি প্রতিশোধ চাই।এবং একদিন প্রতিশোধ নিয়েও ফেললাম। কিভাবে নিলাম সেটা শুনলে হয়তো অবাক হবেন।কোরবানির ঈদের পর চাকু-ছুরী মসজিদেই ছিল। মাগরিবের আজানের পর জ্বীন শুরু করলো তার গা জ্বলানো হাসি। এটা তার নিয়মমাফিক রুটিন যে আমাকে মনে করিয়ে দেয়া যে আমি তার কাছে হারছি। আমারও প্রচণ্ড রাগ উঠে গেলো সাথে সাথে। আজান শেষ করেই হাতড়ে হাতড়ে মসজিদের কোনায় গেলাম। এক বালতির ভেতরে ছিল চাকু গুলা। তুলে নিলাম একটা। বেশিক্ষণ ভাবলাম না, কারন ভাবলে মিমের চেহারা মনের ভেতর আসলে আর আমি আমার প্রতিশোধ নিতে পারবোনা। তাই চাকুটা তুলে, বাম হাত দিয়ে আমার জিভ বের করে টান দিলাম, প্রচন্ড যন্ত্রনায় জিভ লম্বা হয়ে বের হলো, সাথে সাথে ঘ্যাচাং করে কেটে দিলাম চাকু দিয়ে। হাত থেকে জিভ টা পরে গেলো, সাথে সাথে আমিও লুটে পরলাম মেঝেতে।**এখন আমি বসে থাকি মসজিদে। মনে মনে হাসি, আমার মনের হাসি জ্বীনটা বুঝতে পারে। সে জ্বলে যায় ভেতরে ভেতরে আমি জানি। সে ঠিক যেভাবে অত্যাচার করতো আমায় আমিও এখন মানসিক ভাবে তেমনই অত্যাচার করি ওকে। কারন সে আর পাঁচ ওয়াক্ত তার মুন্সীর আজান শুনতে পায়না। আমার জিভ নেই, আমি দিতে পারিনা। সে গমগম করে বলে গেলো এজন্য নাকি আমার বিরাট বড় ক্ষতি হবে। আমার যা ক্ষতি হবার তা তো হয়েই গেছে, আর কি হবে।শুক্রবারে মসজিদে বসে আছি, হঠাৎ বারান্দায় দুইটা বাচ্চার কন্ঠ শুনলাম। তারা গল্প করছে,- শুন, আমি শুনছি আমাগো এই বোবা লোকের লগে নাকি জ্বীন থাকে।- হ হ। আমিও শুনছি, চল পালাই, আমাগো ধরতে আইবো।- আরে নাহ, একটু ভুলকি দিয়া দেইখা চইলা যামু। – আমার ডর লাগতেসে।- কুনো ডর নাই। ওই যে দেখ সেই বোবা, আমাগো কথা শুনতেছে মনে হয়।- চল যাইগা- জানোস আমি এই লোকের মতন আজান দিতে পারি। শুনবি?- তাই? ক দেখি!আমি শুনলাম ছেলেটা আজান শুরু করলো। একদম আমার মত করে। একটু পরেই আমার মনের ভেতর ভয় ঢুকে গেলো। এই ছেলে আমার মত করে আজান দিচ্ছে তার মানে সেও মুন্সীর মত করে আজান দিতে পারে। এই ছেলের খবর জ্বীন পেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। ভাবার সাথে সাথে হাতড়ে হাতরে ছুটলাম তাদের দিকে। বলতে “এদিকে আসো, কথা শুনো..” কিন্তু গলা দিয়ে কিসব অদ্ভুত আওয়াজ বের হলো যা নিজেই বুঝলাম না।কিন্তু ওরা মনে হলো ভয় পেয়ে গেলো। দৌড়াতে শুরু করলো।হঠাৎই আমার ভেতর ভারী কিছু ঢুকে পরলো মনে হলো। আমার হাত পা আমার নিজের অনিচ্ছায় কাজ করা শুরু করলো। আমার দেহের উপর আর কোন নিয়ন্ত্রণ রইলো না আমার।হঠাৎ করেই আমার পা দুটা দৌড়ানো শুরু করলো। হাত দুইটা গিয়ে খপ করে কি জানি ধরলো। আমি বুঝতে পারলাম একটা বাচ্চার গলা ধরেছে সেটা। এবং আমি প্রচন্ড ভয়ে অনুভব করলাম আমার হাত দুইটা শক্ত হয়ে চেপে ধরেছে বাচ্চাটার গলা। ধীরে ধীরে সেটা আরো চেপে যেতে লাগলো। একসময় বাচ্চাটা নিস্তেজ হয়ে পরে গেলো মেঝেতে। পরপরেই আমিও পরে গেলাম নিথর হয়ে। চোখ দিয়ে জল ঝরা শুরু হলো…একটা বাচ্চাকে যে খুন করলাম মাত্র আমি।** খুঁটির সাথে হাত পা বাঁধা অবস্থায় আমি। এলাকার মানুষ রা আমাকে বেঁধে রেখেছে। আমি খুনী। আজান দেয়া বাচ্চাটার সাথে যে ছিল তাকে খুন করেছি আমি। আম্মু আব্বু এসে কান্নাকাটি করে গেছে গতকাল। আমাকে কোন খাবার বা পানি দেয়া হবেনা। আজকে সকাল হলে পুলিশে খবর দিবে তারা। এখন রাত, কতটা রাত তা জানিনা। মনে হচ্ছে ভোর হবে। আমার খালি মিমের কথা মনে পরছে। হায়! তাকে পাওয়ার জন্য কিসব করতে গিয়ে আজ এই অবস্থায় আমি। তাকে পাওয়া হলোনা। তার ছবি এখনো মনে গাঁথা। সেই শেষ যেমন দেখেছিলাম তেমন ছবি। এখন সে কেমন হয়েছে জানিনা। এত বছর পরে নিশ্চিত সে দেখতে আরো সুন্দরী হয়েছে।প্রায় ঘন্টা খানেক পর মনে হলো কিসের যেন আওয়াজ শুনলাম। একটু পর আওয়াজ আরো বাড়লো। অনেক লোকের আওয়াজ।সবাই এদিকেই আসছে। সবাই চিৎকার করছে। একজন কাছে এসে বললো,- শয়তান, শয়তানের চ্যালা, কেমনে পারলি তুই এটা করতে?আরেকজন বললো,- একটা বাচ্চারে খুন করলি, আর আরেকটারে করলি অন্ধ?আরেকজন বললো, “এই লোক সাক্ষাৎ শয়তান, সে এইখানে বান্ধা থাকা অবস্থাতেও ওর শয়তান জ্বীন দিয়া বাবুলের বাচ্চাটারে অন্ধ করছে….”আরেকজন- শালা ওর দাঁতন দিয়া বাচ্চাটার চোখ তুইলা ফেলসে..আল্লাহ মাফ করো!একটু পরে সব বুঝতে পারলাম। জ্বীন তার পরবর্তী মুয়াজ্জিন, সেই বাচ্চাটাকে পেয়ে গেছে। এবং আমারও চুড়ান্ত ক্ষতি করে দিয়ে গেছে। আমাকে দিয়ে প্রথমে একটা বাচ্চাকে খুন করিয়েছে যাতে আমার শাস্তি হয়, এবং আমার দাঁতন দিয়েই সেই বাচ্চাটারে অন্ধ করেছে যাতে বাচ্চাটাকে মুয়াজ্জিন বানাতে পারে আর আমার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকতে পারে।একটু পর এক লোক ঘোষণ দিলো,” এই লোক ডাইনী, এরে পুলিশে দেয়া যাবেনা, এরে আমরা নিজেরাই শাস্তি দিমু, আমার মাসুম বাচ্চারে সে তার শয়তানী ক্ষমতা দিয়া অন্ধ করছে। এরে আমরা আগুনে পুড়ামু, এর ছাই মাটিত পুতুম।”সবাই তার কথা শুনে হৈ হল্লা করে উঠলো। সবাই এই সিদ্ধান্তে খুশি। একটু পর শুনতে পেলাম গমগম গলায় হাসি। সে হাসছে। গা জ্বলানো হাসি। সে যে আবার জিতে গেছে তার বিজয় হাসিই এটা। আমাকে শেষবারের মত তিরস্কার করছে।এরকম অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় হচ্ছে মিমের চেহারা মনে করা। ওকে মনে করার চেষ্টা করলাম। লোকটা কাছে এসে বললো, “মড়ার আগে তোর কিছু কওয়ার আছে? জিব্বা তো নাই তাও কিছু কওয়ার থাকলে চেষ্টা কর”আমি অনেক কষ্টে বললাম, “ম-মি-ম…মি-ম…”লোকটা মনে হয় বুঝলো, বললো,”মিম? তুই জানোস তুই মিমের কত বড় ক্ষতি করছোস? মিম আমার বউ, আর তুই তারই পুলার চোখ তুইলা নিছোস…মিমের নাম নিস, তোর লজ্জা করেনা কুত্তা?”একথা টা শুনার পর আমার শেষ প্রদীপ টা যেন দপ করে নিভে গেলো। আমার গায়ে কেরোসিন ছেটানো হলো, একটু পর আগুন দেয়া হবে। কিন্তু আমার ভেতরে কোন অনুভূতি নেই। কারন এতদিন বেঁচে ছিলাম যার আশাতে, যাকে ভেবে তারই বিরাট ক্ষতি করে দিয়েছি আমি।আমার শরীরে আগুন জ্বলে উঠলো, তাপ অনুভব করতে পারলাম। সেই #অট্টহাসি আবার শুনতে পেলাম, কিন্তু এই শেষমুহুর্তে আমি জ্বীনটার কাছে হারতে চাইনা যে আর…তাই চিরনিদ্রায় যাবার আগে শেষবারের মত মিমের চেহারা টা মনে করার চেষ্টা করলাম।

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here